বৃহস্পতিবার, ১৬ Jul ২০২৬, ০২:৪৭ পূর্বাহ্ন
খেলাধুলা ডেস্ক:
বিশ্বকাপ মানেই শুধু গোল, ট্রফি আর তারকাদের জাদু নয়; কখনো কখনো কিছু ঘটনা ফুটবল ইতিহাসে এমনভাবে জায়গা করে নেয়, যা কয়েক দশক পরও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে যখন আর্জেন্টিনা ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে, তখন আবারও সামনে চলে এসেছে আর্জেন্টিনার পুরোনো বিতর্কিত অধ্যায়গুলো। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত একটি হলো ১৯৯০ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের খেলোয়াড়কে আর্জেন্টিনার দেওয়া ‘রহস্যময় পানি’র ঘটনা। যা বিশ্বকাপ ইতিহাসের ‘হলি ওয়াটার স্ক্যান্ডাল’ নামে পরিচিত।
কিন্তু প্রশ্ন হলো সত্যিই কি আর্জেন্টিনা ব্রাজিলের খেলোয়াড়ের পানিতে কিছু মিশিয়েছিল? আর্জেন্টিনা কি কখনো তা স্বীকার করেছে? নাকি এটি শুধুই বিশ্বকাপের আরেকটি কিংবদন্তি গল্প?
ঘটনাটি ঘটে ইতালিতে অনুষ্ঠিত ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে। মুখোমুখি হয়েছিল চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা। ম্যাচে ব্রাজিল ছিল দারুণ আক্রমণাত্মক, কিন্তু গোল পাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত দিয়েগো ম্যারাডোনার অসাধারণ পাস থেকে ক্লদিও কানিজিয়া গোল করে আর্জেন্টিনাকে ১-০ ব্যবধানে জয় এনে দেন। তবে ম্যাচের ফলের চেয়েও বেশি আলোচনায় আসে একটি পানির বোতল।
কী হয়েছিল সেই পানির বোতলে?
ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে মাঠের খেলা যখন সাময়িকভাবে বন্ধ ছিল, তখন আর্জেন্টিনার ফিজিও মিগুয়েল ডি লরেঞ্জো ব্রাজিলের ডিফেন্ডার ব্রাঙ্কোকে একটি পানির বোতল পান করতে দেন। ব্রাঙ্কো সেই পানি পান করার পর থেকেই প্রচণ্ড মাথা ঘোরা ও শারীরিক দুর্বলতা অনুভব করতে শুরু করেন। পরে তিনি অভিযোগ করেন, বোতলে কোনো ধরনের পদার্থ মেশানো থাকতে পারে। এই ঘটনাই পরে পরিচিত হয় ‘ব্র্যাঙ্কোর বোতল’ নামে।
কী মেশানো হয়েছিল বলে দাবি?
পরবর্তীতে ব্রাজিলের খেলোয়াড় ও কর্মকর্তারা অভিযোগ করেন যে, ওই পানির বোতলে ঘুমের ওষুধ বা ট্র্যাঙ্কুইলাইজার মেশানো ছিল। দীর্ঘ সময় ধরে এটি নিছক গুজব বলে মনে করা হলেও, পরবর্তীতে আর্জেন্টিনার তৎকালীন কোচ কার্লোস বিলার্দো এবং কিংবদন্তি খেলোয়াড় দিয়েগো ম্যারাডোনা বিভিন্ন টিভি শো ও সাক্ষাৎকারে ইশারা-ইঙ্গিতে ও রসিকতার ছলে স্বীকার করেন যে, ওই বোতলের পানি সাধারণ ছিল না। দিয়েগো ম্যারাডোনা দাবি করেন, বোতলে রোহিপনল নামের একটি ঘুমের ওষুধজাতীয় পদার্থ ছিল। তার দাবি, বিষয়টি দলের কয়েকজন জানতেন। ম্যারাডোনার এই বক্তব্যের পর বিতর্ক আরও তীব্র হয়। অনেকেই বলেন, এটি ছিল প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার উদ্দেশ্যে করা একটি অনৈতিক কৌশল।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঘটনার কোনো বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা বা আনুষ্ঠানিক প্রমাণ কখনো পাওয়া যায়নি। ওই পানির নমুনা পরীক্ষা করা হয়নি। ফলে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না, সত্যিই কোনো ওষুধ মেশানো হয়েছিল কি না।
আর্জেন্টিনার পক্ষ থেকে এটি নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকারোক্তি নেই। তবে দলের কয়েকজন সদস্য বিভিন্ন সময়ে ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। ম্যারাডোনা একাধিকবার ঘটনাটির কথা বলেছেন এবং নিজের বক্তব্য থেকে সরে আসেননি। অন্যদিকে তৎকালীন কোচ কার্লোস বিলার্দো এবং দলের ম্যাসাজ থেরাপিস্ট মিগুয়েল দি লোরেঞ্জো (গ্যালিন্দেজ) অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, পুরো ঘটনাই বাড়িয়ে বলা হয়েছে। আর্জেন্টিনার সাবেক ফিজিক্যাল ট্রেনার ফার্নান্দো সিগনোরিনিও একসময় এই বিতর্ক নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন এবং ঘটনাটিকে গুরুতর বিষয় হিসেবে দেখেছিলেন।
‘হ্যান্ড অব গড’ থেকে ‘রহস্যময় পানি’
আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে বিতর্ক নতুন নয়। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যারাডোনার বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল আজও ফুটবলপ্রেমীদের আলোচনায় থাকে। ফকল্যান্ড যুদ্ধের মাত্র চার বছর পর সেই ম্যাচে রাজনৈতিক আবেগও জড়িয়ে গিয়েছিল।
আর ১৯৯০ সালের ব্রাজিল ম্যাচের ‘পানির বোতল’ ঘটনা যোগ করে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ ইতিহাসে আরেকটি রহস্যময় অধ্যায়। তবে পার্থক্য হলো ‘হ্যান্ড অব গড’ ছিল মাঠের একটি দৃশ্যমান ঘটনা, কিন্তু ‘ব্র্যাঙ্কোর বোতল’ আজও রয়ে গেছে অভিযোগ, স্মৃতি ও বিতর্কের মধ্যে।
পুরোনো বিতর্ক কেন ফিরে আসছে?
২০২৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা আবারও শিরোপার অন্যতম দাবিদার। সেমিফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড যে দলের সঙ্গে আর্জেন্টিনার ইতিহাসে রয়েছে ফকল্যান্ড যুদ্ধ, ১৯৮৬ সালের ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং ১৯৯৮ সালের নাটকীয় লড়াই। ফলে আর্জেন্টিনাকে ঘিরে পুরোনো গল্পগুলো আবার আলোচনায় আসছে। কেউ মনে করছেন এগুলো ফুটবল ইতিহাসের রোমাঞ্চকর অংশ, আবার কেউ এগুলোকে দেখছেন বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে। শেষ পর্যন্ত ‘ব্র্যাঙ্কোর পানি’ সত্যিকারের ষড়যন্ত্র ছিল, নাকি বিশ্বকাপের আরেকটি কিংবদন্তি তার চূড়ান্ত উত্তর হয়তো আর কখনো পাওয়া যাবে না। কিন্তু ফুটবল ইতিহাসে এই ঘটনা যে চিরকাল আলোচনায় থাকবে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই।
সূত্র: হলার ম্যাগাজিন, মিডিয়াম/ভয়েস/আআ